কল্লোল মোস্তফা
টেংরাটিলা গ্যাস বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ এড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ICSID তে নাইকোর দায়ের করা মামলার শুনানি চলছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, বাসস পরিবেশিত খবর থেকে দেখা যায় লন্ডনে ১৬-১৭ অক্টোবর, ২০১১ এই দুই দিন ধরে এই শুনানি চলবে।
সূত্র: http://www.bssnews.net/bangla/newsDetails.php?cat=6&id=102598&date=2009-05-09
গত ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে দুই দু্ইটি বিষ্ফোরণের মাধ্যমে নাইকো সিলেটের টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্র ও তার আশপাশের কৃষিজমি ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে। সরকারের গঠন করা তামিম কমিটির রিপোর্ট অনুসারে মাত্র ৩ বিসিএফ(বিলিয়ন কিউবিক ফিট) গ্যাস নষ্ট হওয়ার কথা বলা হলেও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি সহ তেল-গ্যাস-বিদ্যুত-বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির হিসেব অনুসারে সেখানে অন্তত: ২৬৫ বিসিএফ গ্যাস নষ্ট হয়েছে।
সূত্র: ডেইলিস্টার,০৯ সেপ্টম্বর২০১১
http://www.thedailystar.net/2005/09/09/d5090901075.htm
পরিবেশ ও কৃষি’র ক্ষতিপূরণ বাদ দিলেও শুধু মাত্র ২৬৫ বিসিএফ গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজার দরে প্রতিহাজার ঘনফুট ১০ ডলার করে কিনতে গেলে এখন লাগবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। অথচ পেট্রোবাংলা তামিম কমিটির রিপোর্ট অনুসারে নাইকোর কাছ থেকে দাবী করেছে মাত্র ৭৪৬ কোটি টাকা। সেই ক্ষতিপূরণও নাইকো দিতে রাজী হয় নি। সেই ক্ষতিপূরণ এড়ানোর জন্য নাইকো বিশ্ব ব্যাংকের অধীনে বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ICSID(International Centre for Settlement of Investment Dispute) এর কাছে গত বছরের ২৭ মে তে একটি মামলা দায়ের করে। আইসিএসআইডি কেইস নং: ARB/10/11. নাইকো এই মামলায় পেট্রোবাংলা কর্তৃক নাইকোর কাছ থেকে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছে। তাছাড়া একই বছরের ২৮ জুলাই পেট্রোবাংলার কাছ থেকে বকেয়া পাওনা আদায়ের জন্য আরেকটি মামলা দায়ের করে। আইসিএসআইডি কেইস নং: ARB/10/18.
ছবি:১ প্রথম মামলার বিবরণ

ছবি২: দ্বিতীয় মামলার বিবরণ
উভয় মামলার জন্য আইসিএসআইডি কর্তৃক একটি ট্রাইবুনাল গঠিত হয় ২০ ডিসেম্বর ২০১০ এ যেখানে প্রেসিডেন্ট হিসেবে Michael E. SCHNEIDER নামে একজন জার্মান এবং আরবিট্রেটর হিসেবে Campbell McLACHLAN (নিউজিল্যান্ড) এবং Jan PAULSSON(ফ্রান্স) নিয়োগ দেয়া হয়। নাইকোর পক্ষ থেকে আইনজীবি নিয়োগ দেয়া হয়েছে কানাডার Gowling Lafleur Henderson কে আর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে Tawfique Nawaz নামের এক আইনজীবিকে যার পরিচয় সম্পর্কে খোজ খবর করতে দেখা যাচ্ছে তিনি Juris Counsel,নামের একটি banking and litigation firm এর প্রধান(সূত্র: http://www.doulah.net/pdf/asialaw.pdf)। তার আরেকটি পরিচয় হলো তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী দিপু মণির স্বামী যার সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে দিপু মণি সম্পর্কিত প্রোফাইলে বলা আছে: “Dipu Moni is married to Tawfique Nawaz, one of two Oxbridge educated Senior Advocates of the Bangladesh Supreme Court, Head of an internationally reputed law firm and a parampara (generational) exponent of at least a 2000 year old Indian Classical Musical form, namely Alaap,on the Grande Flute.”
http://www.mofa.gov.bd/CV/bdfmprofile.pdf
নাইকো’র মামলায় তৌফিক নেওয়াজের নিয়োগকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে অনলাইনের এই লেখাটিতে:
One Tawfique Newaz and our national interest
http://rumiahmed.wordpress.com/2011/04/06/one-tawfique-newaz-and-our-national-interest /
আমরা জানিনা, ঠিক কোন বিবেচনায় তৌফিক নেওয়াজ সাহেবকে নাইকো’র মামলায় বাংলাদেশের পক্ষের আইনজীবি হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে বিরোধ মীমাংসার আইনি লড়াইয়ে তার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতার কোথাও শোনা যায় না। কিন্তু আমরা জানি কিভাবে উপযুক্ত আইনজীবি নিয়োগ না করা ও প্রস্তুতিহীনতার ফলে এর আগে বাংলাদেশ কেয়ার্নের সাথে মামলায় পাইপ লাইন ভাড়ার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। UNB Connects পরিবেশিত এক খবর থেকে দেখা যায়, সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্র থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে শেল-কেয়ার্ন পেট্রোবাংলার স্থাপন করা পাইপ লাইন ব্যাবহার করছিলো। ১১ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত চুক্তির আর্টিক্যাল ৪.১৭ অনুসারে শেল-কেয়ার্ন নিজ খরচে নিজ অবকাঠামো ব্যাবহার করে এই গ্যাস পরিবহন করার কথা। তা না করে পেট্রোবাংলার অবকাঠামো ব্যাবহার করায় স্বাভাবিক ভাবেই পেট্রোবাংলা শেল-কেয়ার্নের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছিল। ২০০১ সালে শেল-কেয়ার্ন আইসিএসডি’তে এই ভাড়া আদায় বন্ধ করার দাবীতে মামলা করে। মামলায় তৎকালিন চারদলীয় জোট সরকার বিএনপি লবির আইনজীবি খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশের পক্ষের আইনজীবি হিসেবে নিয়োগ করে। কিন্তু আইনজীবীর অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশ এই ন্যায্য মামলাটিতেও হেরে গিয়ে শত কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয় যদিও পরবর্তীতে একই ধরণের দাবীতে ২০০৭ সালে শেভরণের দায়ের করা মামলায় শেভরণের কাছ থেকে পাইপ লাইনের ভাড়া বাবদ আদায় করা ২৪ কোটি ডলার বেচে যায় বাংলাদেশের । সে মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবী ছিলো ড.কামাল হোসেন এন্ড এসোসিয়েটস। UNB Connects জানাচ্ছে এবারেও অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করে জুলাই ২০১০ সালে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর স্বাক্ষরিত চিঠিতে ড.কামালকেই নিয়োগ দেয়ার চিঠি দেয়া হলেও এক মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তৌফিক নেওয়াজকে নিয়োগ করা হয়। এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে বাপেক্সের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমেদ ফারুক ইউএনবিকানেক্ট কে বলেন: “এটা সরকারের সিদ্ধান্ত।”
সূত্র: http://www.unbconnect.com/component/news/task-show/id-47667
এখানে বিষয়টা পরিস্কার করে নেয়া ভালো যে, বাংলাদেশের পক্ষে ড.কামালকে নিয়োগ দেয়া হলো কি না হলো সেটা আমাদের বলার বিষয় না, ড.কামালের প্রসঙ্গটি এসেছে এই খাতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে, বিএনপির আইনজীবী খন্দকার মাহবুব উদ্দিনের হেরে যাওয়া মামলার মতো একই ধরণের মামলায় যে আইনজীবীর দক্ষতার কারণে জয় লাভ করা যায় সেটা উপস্থাপন প্রসঙ্গে। আমাদের মূল প্রশ্ন হলো, নাইকোর মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে তৌফিক নেওয়াজকে নিয়োগ দেয়ার সময় এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছে কি না? নাইকোর ক্ষতিপূরণ এড়ানোর মামলাটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এমনিতেই বাংলাদেশ প্রকৃত ক্ষতিপূরণের চেয়ে অনেক কম ক্ষতিপূরণ চেয়েছে নাইকোর কাছ থেকে, এখন এই মামলা দুটোতে হারলে বাংলাদেশ এই ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত তো হবেই, উল্টো ফেনী গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস ক্রয় বাবদ বকেয়া বিলও বৈদেশিক মুদ্রায় নাইকোকে পরিশোধ করতে হবে। ফলে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়েই এই মামলাটি পরিচালনা করা উচিত ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোন কিছুই জানানো হয় নি জনগণকে। ফলে আমরা জানতে চাই, নাইকোর ক্ষতিপূরণ এড়ানো মামলা মোকাবিলার ব্যাপারে কি ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছিল বাংলাদেশ এবং ঠিক কী কী বিবেচনায় জাতীয় স্বার্থে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তৌফিক নেওয়াজ নামের জ্বালানি সেক্টরের মামলা মোকদ্দমায় অপরিচিত এক আইনজীবীকে নিয়োগ দেয়া হলো? এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কি রক্ষিত হলো? আর এর ফলে টেংরাটিলা বিষ্ফোরণের ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় বাংলাদেশ যদি হেরে যায় তাহলে তার দায় কার?


