Tuesday, May 21st

Last update12:56:41 PM GMT

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
You are here Resistance Resistance পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া ......... (রোড মার্চ- ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম)

পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া ......... (রোড মার্চ- ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম)

First published:
http://www.countercurrents.org/anu181011.htm

কনোকোফিলিপস-এর সঙ্গে চুক্তি বাতিল, পিএসসি ২০১১ প্রক্রিয়া বন্ধ করে সুনেত্র গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন এবং উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ, এশিয়া এনার্জি বহিষ্কারসহ ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন এর দাবীতে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে ২৬-২৮ অক্টোবর ২০১১ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রোড মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্পর্কে অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন বীথি চৌধুরী।

বীথি চৌধুরী
শিক্ষক ও লেখক
Email: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it '; document.write( '' ); document.write( addy_text42764 ); document.write( '<\/a>' ); //--> This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it


প্রেসক্লাবে জমায়েত হয়ে সেখান থেকে মিছিল করে গিয়ে আমরা যখন মুক্তি ভবনের সামনে সারিবাঁধা অপেক্ষমান বাসগুলিতে চড়ে বসলাম তখন একই সাথে নানা কারনে যেতে না পারা বিদায় দিতে আসা বন্ধুদের মলিন হাসির বেদনা আর এমন একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্যে অংশ নিতে পারার আনন্দে আমরা দিশেহারা ছিলাম। তখন বেলা ১১টা। ''আমার মাটি আমার মা, নাইজেরিয়া হবে না'', ''পাইপ লাইনে রক্ত যাবে তেল গ্যাস যাবে না'' মূহুর্মুহু এমনি সব শ্লোগানে চারপাশ সজাগ-সচকিত করে দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হল - ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বরের ঢাকা টু চট্টগ্রাম রোড মার্চে। চারটি বাস, দুটি পিক আপ ভ্যান আর একটি মাইক্রোবাস ছিল আমাদের সাথে। নেতৃবৃন্দসহ দুই শতাধিক কর্মী অংশ নিয়েছিলেন এই মার্চে। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম পেরিয়ে বাস ছুটে চলল। মনে মনে গেয়ে উঠলাম -

''.........থাকনা হাজার অযুত বাঁধা, দীর্ঘ দূর যাত্রায় কিসের ভয়! কিসের ভয় সাহসী মন লাল ফৌজের, লাফিয়ে হই পার .........''

The marchers of the `National Committee to protect  oil-gas-mineral resources, power and port ‘ are distributing leaflets to campaign for seven-point demansds including scrapping  the deal with ConoccoPhilips, implementation of Phulbari agreement during Dhaka-Chittagong road march (26-28 October 2011).  Photo by Bithi Chowdhury প্রথমেই সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হল অবিভক্ত ডেমরা থানার শনির আখড়ায়। সেখানে বক্তব্য দেন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহম্মদ সহ স্থানীয় কমিটির আহবায়ক মিজানুর রহমান, সদস্য সচিব আরিফুর রহমান এবং যুগ্ম আহবায়ক পারভেজ আলম। মার্চে অংশ নেয়া কর্মী ছাড়া সেখানে স্থানীয় উপস্থিতি ছিল ২০০-র মত। আবার যাত্রা ........ আবার ছুটে চলা।

এবার বাস থামল কাঁচপুর ব্রীজ এলাকায়। এখানেও উপস্থিতি ২০০ থেকে ২৫০ এর মত ছিল। কর্মীদের লিফলেট বিতরণের ছুটোছুটির মাঝেই চলে বক্তব্যের পালা। এখানে জাতীয় কমিটির অহবায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সহ বক্তব্য দেন অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, রুহিন হোসেন প্রিন্স, বজলুর রশীদ ফিরোজ ও আবু হাসান টিপু।কাঁচপুর ব্রীজের পরে আমরা গিয়ে থামলাম ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁ-এ। সেখানে প্রথমেই পরিবেশিত হল সংস্কৃতি মঞ্চের ব্যানারে কাজী শহীদুল ইসলামের নির্দেশনায় পথ নাটক 'সাগর লুট'। ঢাকা ছাড়ার পর এই তৃতীয় সমাবেশটি এমন হয় যে প্রচণ্ড গরমে ঘামে জবজবা হয়েও আমরা সকলে কেমন একটি উত্সবের আমেজে মেতে উঠি। একদিকে পথ নাটক, অন্য দিকে চলছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের উদ্যোগে কার্টুন প্রদর্শনী। তার মাঝে শ'দেড়েক লোকের উপস্থিতিতে নেতৃবৃন্দ বক্তব্য শুরু করেন। ক্রমে লোক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ থেকে ২৫০ এর মত। স্থানীয় কমিটির আহবায়ক শাহেদ কায়েস এর সভাপতিত্বে ও জিয়া হায়দার ডিপটির পরিচালনায় সভায় অধ্যাপক আনু মুহম্মদ ও অধ্যাপক আকমল হোসেন সহ বক্তব্য রাখেন শংকর, আব্দুস সালাম বাবু, বেলায়েত হোসেন ও তোফাজ্জল হোসেন দুলাল।

এরপর কুমিল্লার চান্দিনায় দুপুরের খাবার বিরতি ও জনসভার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা। এখানে পৌঁছে অদ্ভুত একটি ঘটনা ঘটে। হাইওয়ে থেকে আমাদের বাসগুলি যখন শহরের মধ্যে পৌঁছালো তখন সেখানে স্থানীয় নেতা কর্মীদের রাস্তায় এগিয়ে এসে সারি বেঁধে শ্লোগানে শ্লোগানে মার্চ-এর যাত্রীদের বরণ করে নেয়াটা যেন মূহুর্তে আমাদের পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। এ ওকে জড়িয়ে ধরছে আর শ্লোগান দিচ্ছে। এভাবেই পৌঁছে গেলাম সেখানে যেখানে আমাদের দুপুরের খাবারের বন্দোবস্ত হয়েছে। টিউবয়েল এর ঠাণ্ডা জলে মুখ হাত ধিয়ে আমরা সকলে এক সারিতে দাঁড়িয়ে গেলাম থালা হাতে।চাল ডাল দিয়ে রাধা নরম খিচুড়ি - আহা ! যেন ক্ষুধার পেটে অমৃত ! খাবার পরেই শুরু হল মিছিল। ছোট্ট শহরটির দেড় কিলোমিটার-এর মত রাস্তা পায়ে হেঁটে শ্লোগানে শ্লোগানে পৌঁছে গেলাম মূল রাস্তায়; যেখানে আবার প্রদর্শিত হল পথ নাটক, সেই সাথে বক্তব্য। এখাবে বক্তব্য দিলেন শেখ মুহম্মাদ শহীদুল্লান। তিনি তার বক্তব্যে রো্ড মার্চের কারন ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে চান্দিনাবাসীকে এই আন্দোলনে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

আবার পথ ...আবার ছুটে চলা ...... বিরামহীন ....... বিশ্রামহীন ...... যেন এক অনন্ত যাত্রা। ''...... আর কত পথ হাঁটলে, কত পায়ে পায়ে কাঁটা ফুটে রক্তাক্ত করলে রাজপথ, কত শ্লোগানে কণ্ঠ চিরে ভারী করলে দিনের বাতাস, কত বিমর্ষ চাঁদ ডুবে আঁধার হলে রাতের আকাশ তুমি-আমি- আমরা পাবো প্রাপ্য যা কিছু .........যা কিছু হায়েনার অধিকারে আছে, অথচ যা মূলত আমারি শিশুর দাবী; তারই সম্পদ !!......আর কত পথ ; আর কত!!

দিনের শেষ গন্তব্য কুমিল্লা শহর। আমরা যখন টাউনহল মাঠে উপস্থিত হলাম তখন সেখানে চলছিল শহীদ মিনারের পাদদেশে প্রস্তুত সভার আয়োজন। কোন বিশ্রাম বা বিরতি ছাড়াই শুরু হল সভার কাজ। জাতীয় কমিটির কুমিল্লা জেলা আহবায়ক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব নাসিরুল ইসলাম মজুমদারের পরিচালনায় বক্তব্য দেন স্থানীয় নেতা মনিরুল ইসলাম তানভীর, আনোয়ার হোসেন, শহীদ মোঃ বিল্লাল ও আবু তালেব। কেন্দ্রিয় কমিটির পক্ষে বক্তব্য দেন শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক আনু মুহম্মদ, অধ্যাপক আকমল হোসেন, সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ, কামরুল আহসান, টিপু বিশ্বাস, সাইফুল হক, আব্দুস সাত্তার, মোশারেফ হোসেন নান্নু, মোজাহিদ আহমেদ, আবুল হাসান রুবেল, বাবুল বিশ্বাস, শামসুজ্জোহা, ইয়াসিন আলী, মাসুদ খান এবং সুবোল সরকার।

সভা শেষে শুরু হয় গণসঙ্গীত আর পথ নাটক। রাত বাড়তে থাকে, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি। টাউন হল মাঠে যেন মেলা বসেছে। সে মেলা কেবল আনন্দেরই নয়; বরং প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জন্যে গণমানুষের মিলিত শক্তিরও যেন সমাবেশ। না পাওয়ার হাহাকার নেই, বরং 'কেন পাবো না? পেতেই হবে; এই পৃথিবী ঐ আকাশে যতটা আমার প্রাপ্য' এমনি ধারা প্রতিজ্ঞায় অটল প্রতিটি মুখ। যেন-''আকাশ ফেঁড়ে আনবে ছিঁড়ে স্বপ্ন থোকা থোকা''।

এক সময় শেষ হল আয়োজন। টাউন হল মাঠের পারেই বীরচন্দ্র মাণিক্যের নামে গড়ে ওঠা বিশালাকার ও পুরাতন পাঠাগার। তাতেই আমাদের রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা। আয়োজকদের আতিথ্যে আমরা মুগ্ধ ! সুনীতি স্মৃতি পাঠাগারের স্বেচ্ছাসেবক বন্ধুদের সুশৃংখল পরিবেশনায় শেষ হল রাতের খাবার। ঐ সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নীচতলা-দোতলার কামরাগুলির ফ্লোরেই সকলে এলিয়ে দিল গা। নারী কমরেডদের জন্যে ব্যবস্থা হল অডিটরিয়ামের কাঠের মঞ্চ। এত যে ক্লান্তি, এত যে পেরিয়ে আসা পথ, পায়ে হেঁটে পেরোনো দীর্ঘযাত্রা .... তবু ঘুমহীন চোখের পাতা। সারাদিনের অভিজ্ঞতা বিনিময়, এ ওর গায়ে গড়িয়ে হাসি। রাত গভীরতর হলে আজানিতেই ঘুমে ঢোলে পড়া। ভোর না হতেই আবার প্রস্তুত কাফেলা। শহীদ মিনারের পাদদেশে, কেউ বা মাঠে, কেউবা টানানো সামিয়ানার নীচে বসে গেছে দল বেঁধে সারাদিনের নির্দেশনা দিতে-নিতে। সব শেষে আবার .......... ''আবার প্রকম্পিত চারিদিক শ্লোগানে শ্লোগানে নেমে আসা পথে মিছিলের ধুলো পায়ে পায়ে ঢেকে দেয় মেঘশূন্য সুনীল আকাশ।বন্ধু, আমিও প্রস্তুত ! প্রস্তুত আরবার !! ..........."


মিছিল প্রদক্ষিণ করে কুমিল্লা শহর। স্থানীয় কিছু বন্ধুকে সাথে নিয়ে বাকিদের থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা শুরু ফের- ফেনীর পথে।মাঝে আমরা নামলাম কুমিল্লারই সুয়াগঞ্জ বাজারে। এখানকার সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেন, '' সরকার নিজেদের স্বার্থে বিদেশি কোম্পানিকে ভর্তুকি দিয়ে লোকশান করে। সেই লোকশান পোষাতে আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ায়; আমাদের জীবন অতিষ্ট করে তোলে।আমাদের আন্দোলন এই সংকট সৃষ্টিকারী বিদেশি কোম্পানীর মুনাফার পাহাড় গড়ার বিরুদ্ধে লড়াই।'' তিনি আরো বলেন, '' আমাদের সম্পদের উপর অন্যায্য নখল দারিত্বের কারনেই এই সব কোম্পানিগুলো আমাদের সম্পদ নিয়ে যেতে পারছে। সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করা ছাড়া, জনগণের ঐক্য ও শক্তি ছাড়া এ থেকে রক্ষা পাবার কোন উপায় নেই।''ফেনী পৌঁছানোর আগে আমাদের আরো একটি বাজারে সভা করার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারনে না থেমেই আমরা চলে যাই ফেনী বাসস্ট্যান্ডে। মিছিল করে যাব শহরের মধ্যে অবস্থিত একটি কমিউনিটি সেন্টারে। দুপুরের খারার যোগাড় ওখানেই। মিছিল কিছুদূর যেতে না যেতেই আকাশ ভেঙ্গে নামল যেন মাথার পরে। সে কি তুমুল বর্ষণ ! তারই মধ্যে চলল মিছিল, চলল শ্লোগান - ' মা-মাটি-মোহনা, বিদেশিদের দেব না', 'আমার দেশের সম্পদ, আমার দেশেই রাখব', 'শ্রমিক কৃষক জনতা, গড়ে তুলি একতা'......... ভিজে সব জবজবা !! সেই জল গায়ে শুকাতে শুকাতে সকলে দাঁড়িয়ে গেল সারিবদ্ধ; একই লাইনে ........... খাবার নিতে।

খাবার শেষ হবার আগেই খবর এল, পুলিশ আমাদের শহীদ মিনারের সভাস্থলের চেয়ার নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় কমিটির সদস্যরা ছুটলেন ঘটনা সামাল দিতে। থানা আর পৌর মেয়রের অফিসে ছুটোছুটি করে সভা করার যা-ই হোক ব্যবস্থা করা হল কিন্তু ততক্ষনে বেলা অনেক। দুপুরের জনসভা শুরু হল ৪.৩০ - ৫.০০ নাগাদ। জাতীয় কমিটির স্থানীয় কমিটির আহবায়ক এ কে এম ফায়জুল হক-এর সভাপতিত্বে ও জসীম উদ্দিন-এর পরিচালনায় এ সভায় যারা বক্তব্য দিলেন তারা হলেন, স্থানীয় কমিটির হারাধর চক্রবর্তী ও মহিবুল হক চৌধুরি।এছাড়া কেন্দ্রিয় কমিটির ১৫ জন নেতা বক্তব্য দেন। জনসভা অর্ধের শেষ হবার আগেই সন্ধ্যা নেমে আসে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সভাস্থলে বিদ্যুত সংযোগ দিতে অস্বিকৃতি জানায়। তাই মোমের আলোয়-ই চলে শহীদ মিনার চত্বর উপচে পড়া শ্রোতাদের নিয়ে সভা। এখানে জনসভা শুরুর আগে স্থানীয় উদিচি শিল্পী গোষ্ঠী গণসংগীত পরিবেশন করেন। এখানে আনু মুহম্মদ তার বক্তব্যে রশিদপুরের প্রাপ্ত তিন টিসিএফ গ্যাসের বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, '' বিদেশি কোম্পানীর কাছে আওয়ামিলীগ, বিএনপি মুচলেকা দিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তাদের স্পষ্ট করেই বুঝতে হবে যে জনগণ কাউকে মুচলেকা দেয় নাই। দাসত্বের কোন স্বাক্ষর জনগণ করে নাই। আর তাই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণই এই চাপিয়ে দেওয়া শৃংখল থেকে মুক্ত হবে।'' তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে 'বিশ্বচোর' আখ্যা দিয়ে বলেন, ''সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নামে এই এই বিশ্ব সন্ত্রাসী দেশে দেশে রক্তপাত, সামরিক অভ্যুত্তান এবং মানুষের সম্পদ ধ্বংস ও লুণ্ঠণ করছে। আমরা এই দানবদের বিরুদ্ধে লড়ছি। এ লড়াই আপাত দৃষ্টিতে কঠিন মনে হলেও এমন লড়াইয়ে জিতে যাবার অসংখ্য সাক্ষ্যও পৃথিবীতে রয়েছে। মানুষের মধ্যে যদি আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়, স্বপ্ন তৈরি হয়, সন্তানের জন্যে নিশ্চিত ভবিষ্যত নির্মাণের ইচ্ছে তৈরি হয় তবে তাঁকে থামানোর সাধ্য এই সব দানবদের নেই। ফুলবাড়ী তার জ্বলন্ত সাক্ষী। সেখানকার জনগণ বুঝে গিয়েছিল যে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুললে কোম্পানী মুনাফা পাবে। বাংলাদেশ পাবে ধ্বংস প্রাপ্ত ভূমি, উদবাস্তু নারী ও শিশু, হা হয়ে থাকা শূন্য কয়লা খনি আর ভয়ংকর স্বপ্নহীন ভবিষ্যত্। ফুলবাড়ী বাসী তাই দেশের জনগনকে সাথে নিয়ে সেই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল।'' অধ্যাপক আনু মুহম্মদ তার বক্তব্যে জনগনকে হুশিয়ার করে বলেন, ''যাদেরকে আপনারা অতিথি ভাবছেন, ভাল করে খোঁজ নিন, দেখুন সেসব বিদেশি কোম্পানীরা আসলে ডাকাত। আলী বাবা ও তার চল্লিশ চোর গল্পে চোরদের যেমন চেনা যায়নি, এদেরকেও চেনা তেমনই কঠিন। এদের চিনে, এদের প্রতিহত করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত।''ওদিকে মিরসরাই জনসভার সময় ছিল বিকেল বেলা। দেরি হওয়াতে অগ্রবর্তী টিম, সংস্কৃতি মঞ্চের বন্ধুরা এবং জাতীয় কমিটির কয়েকজন নেতা আগেই রওনা দেন সেদিকে। ফেনীর সভা শেষ করে আমরা যখন মীরসরাই পৌঁছাই তখন রাত প্রায় ৯টা। বিকেল ৫টায় শুরু হওয়া জনসভায় আসা জনসাধারন যে তখনও সেখানে অপেক্ষা করছেন দেখে সত্যি-ই অবাক হই আমরা। বাস থেকে নেমেই আমরা হুঢ়ুড় করে ঢুকে পড়ি সভায়। যারা বক্তব্য দেবেন তারা মঞ্চে। সভাটি হচ্ছিল মিরসরাই হাই স্কুল মাঠে। সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ কবীর হোসেন চৌধুরি, সভা পরিচালনা করেন ডাঃ মোঃ জামশেদ আলম। স্থানীয় কমিটির পক্ষে বক্তব্য দেন আব্দুস সালাম, কমল কান্তি ভৌমিক, অশোক সাহা এবং ফরিদুল ইসলাম। কেন্দ্রিয় কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিব সব অনেকেই বক্তব্য দেন।

চশত লোক সমাগম ছিল বলে অগ্রবর্তী টিম আমাদের জানান। রাত বেশি হবার কারনে শেষ পর্যন্ত সভায় উপস্থিতি সংখ্যা ছিল ৩০০-র মত। সদস্য সচিব তাঁর বক্তব্যে আন্দোলনের ধারাবাহিক সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন এবং জাতীয় কমিটির দাবী সমূহ উত্থাপন করেন। এছাড়া বিভিন্ন সরকারের আমলে, বিভিন্ন সময়ে করা বা করার উদ্যোগ নেয়া বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ বিরোধী আইন ও চুক্তি বিষয়েও তিনি আলোচনা করেন। জাতীয় কমিটির এযাবত্ কালের বিবিধ সফলতা ও এ আন্দোলনের অবশ্য প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে আরো ব্যাপক সফলতার জন্যে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানান। তিনি বলেন, '' শিক্ষা খাতে, বিদ্যুত খাতে, রাস্তা ঘাট নির্মাণের সময় সরকার টাকা না থাকার অজুহাত দেয়। অথচ, বিদেশি কোম্পানীকে ভর্তুকি দিতে তাদের টাকার অভাব হয় না। আর এই কাজ করার জন্যে তারা জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে , আমাদের সামর্থ নেই। বিদেশি এসব কোম্পানীর করুণা ছাড়া আমরা অচল।এভাবে তারা আমাদের মধ্যে হীনমন্যতার বীজ গেড়ে দিয়ে, আমাদেরকে হীনমন্যতার অসম্মানের মধ্যে ঠেলে দিয়ে তারা মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। কাজেই হীনমন্যতা থেকে জনগণকে মুক্ত করা আমাদের আন্দোলনের একটি বড় লক্ষ্য। আমাদের যুযোগ দেয়া হলে আমরা যে এ দেশটাকে বদলে দিতে পারি তা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে।''তিনি আরো বলেন, '' মানুষ যদি মানুষ হিসেবে দাঁড়ায়, তাঁর কাছে যদি সঠিক তথ্যটি পৌঁছে দেয়া যায়, তাতে তার মধ্যে ঘাঁটি গাড়া তৈরিকৃত ঘোর কেটে যায় এবং সেই মানুষকে দমিয়ে রাখার সাধ্য কোন দানব শক্তির নেই। কাজেই মানুষকে সেই সঠিক তথ্যটি সরবরাহ করে মানুষ হিসেবে দাঁড়াতে সহায়তা করাই আমাদের আন্দোনলের কাজ। এটি কেবল কর্তব্য বোধ থেকে করাই নয়, বরং এ কাজ আমাদের আনন্দেরও অংশ। ''সভা শেষে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় পাশেরই একটি কমিউনিটি সেন্টারে, যেখানে রাতের খাবার ও পুরুষ কর্মীদের থাকার আয়োজন। সারাদিনের ক্লান্তি সবার চোখে মুখে। নারী কর্মীদের শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল আয়োজকদের কোন এক বন্ধুর বাসায়। অমায়িক মানুষ তারা। আমাদের এত গুলো মানুষের আদর যত্নই কেবল করলেন না,সকালে ঘুম থেকে উঠার আগেই গৃহকর্ত্রী চা-বিস্কুটের আয়োজন করে রেখেছিলেন। চা খেয়ে উনাদের কাছে বিদায় নিয়ে আবার ফিরে এলাম সেই সেন্টারে। সেখানের বন্ধুরা সবাই তখনো ঘুম থেকে জাগেনি। অদ্ভুত দৃশ্য ! মাটিতে সার সার ছেলেরা শুয়ে আছে। কারো মাথার নিচে ব্যাগ, কারো মাথা শীতল মাটিরই আশ্রয়ে ! কুঁকড়ে-মুকড়ে শুয়ে আছে দল বেঁধে। মনে পড়ল সদস্য সচিবের আগের রাতের দেয়া বক্তব্যের কথা ''..... বরং এ কাজ আমাদের আনন্দেরও অংশ।'' সত্যি-ই তাই। নইলে কেমন করে এরা তুচ্ছ করতে পারে রাষ্ট্রিয় নীপিড়নের ভয় ! পথের ক্লান্তি; নির্ঘুম রাতের প্রহর ! দেখতে দেখতে সবাই ঊঠে পড়ল, তৈরি হয়ে নিল ঝটপট। স্থানীয় আয়োজকদের পরিবেশন করা খিচুড়ি খেয়ে সবাই আবার নেমে এলাম পথে .............. "এরা হাঁটে, হেঁটে যায়, আর গতি বাড়ায় প্রতি পদক্ষেপে। কেননা, সূর্যাস্তের আগেই তারা পৌঁছাতে চায় হাজার মাইল।কেননা, ক্ষুধাতুর শিশুর খাদ্য আজ দানবের দখলে।কেননা, মুনাফার হলিখেলায় বন্দি আজ তাবত জ্ঞাতি।কেননা, ওদের প্রতিজ্ঞা সবুজ শষ্যক্ষেত্রের কাছে,দিগন্ত বিস্তৃত সাগরের কাছে; .......''পথে থামলাম সীতাকুণ্ড উপজেলায়। মোঃ মছিউদ্দৌলার সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য দেন শেখ মোঃ শহীদুল্লাহ। উপস্থিত ছিলেন সলিমুল্লাহ সেলিম, মোক্তার আহমেদ, এড. জহিরুদ্দিন মাহমুদ সহ জাতীয় কমিটির কেন্দ্রিয় নেতৃবৃন্দ। অবশেষে আমরা যাত্রা শুরু করলাম আমাদের আপাত শেষ গন্তব্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানের দিকে । বাস ছুটছে। হঠাত হঠাত নজরে পড়ছে পাহাড়ের সারি । আমরা কেউ কেউ ছবি তোলার চেষ্টা করছিলাম; কেউ ''কেন সবগুলো উঁচু পাহাড় ভারতের বর্ডারের মধ্যে পড়েছে '' তাই নিয়ে আলোচনা জুড়ে দিলাম। এরই মাঝে মাঝে চলছিল শ্লোগান, গণসংগীত। চট্টগ্রামে প্রথমেই গেলাম ওখানকার শহীদ মিনারের কাছে সিপিবি'র অফিসে। দুপুরের খাবার বিরতির পর মিছিল করে গেলাম লালদীঘির ময়দানে। সেখানে তখন চলছিল পথ নাটকের পরিবেশনা। এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জামাল নজরুল ইসলাম। সভা পরিচালনা করেন প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন। কেন্দ্রিয় ও স্থানীয় মিলে মোট বিশজন বক্তা এ সভায় বক্তব্য দেন। লা্লদীঘি ময়দান লোকে লোকারণ্য; যেন লালের সমূদ্রে আমরা ডুবে গেলাম ক্রমাগত। হাজার হাজার উপস্থিতির মাঝে অধ্যাপক আনু মুহম্মদ তার বক্তব্যে বলেন, ...........''পৃথিবীর এক নম্বর সন্ত্রাসী রাষ্ট-র কাছে যারা মাথা নত করে, সেই সব মেরুদণ্ডহীন লোভী মানুষদের কাছে আমাদের সম্পদ নিরাপদ নয়। এ দেশের সাধারণ মানুষ যদি বুঝতে পারে দেশের মালিক মূলত তারা, তাহলে এদের দমিয়ে রাখার সাধ্য কারো নেই।''তিনি আরো বলেন,'' যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চল্লিশ বছর লেগেছে, কিন্তু জ্বালানী পাচার করে যারা অপরাধ করছেন তাদের বিচার করতে জনগণ এত বেশি সময় নেবে না। ''২৮ তারিখ সন্ধ্যায় লালদীঘির সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হল তিনদিনের রোড মার্চ। ফিরতি পথে যাত্রা শুরু হল। ঘরে ফিরে এলাম যার যার। কিন্তু সাথে করে যেন বয়ে নিয়ে এলাম পথে পথে ছড়িয়ে দিয়ে আসা অঙ্গীকারের দায়। যে দায় থেকে তৈরি হওয়া আত্মবিশ্বাস নিশ্চিত ভাবেই ঠেকিয়ে দেবে সাম্রাজ্যবাদের দালাল, মুনাফা লোভী বহুজাতিকের লম্ফ-ঝম্ফ। সেই সাথে উচ্ছিষ্ট ভোগী দেশীয় দালাল গোষ্ঠীর মুখে ছুঁড়ে দেবে চুনকালি।পথে পথে সাধারন মানুষের চোখে মুখে যে আগ্রহ ও উত্সাহ দেখেছি তাতে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, 'বিজয় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র'।

 

Add comment


Security code
Refresh